২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৮শে সফর, ১৪৪৪ হিজরি
www.motherlandnewsbd.com

রাজশাহী শহরের মাঠ গুলো দখল করে নিচেছ অফিস আদালত

জামি রহমান,নিজস্ব প্রতিনিধি: শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাসে বাঁধা খেলার মাঠের অভাব। চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকছে আজকাল শিশু -কিশোররা। এ দিকে বিভাগীয় শহর গুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যতোটুকু মাঠ আছে তাও আবার অফিস আদালতের ভবন তৈরি হচ্ছে। পরিত্যক্ত মাঠ গুলোও আজ দখলে চলে যাচ্ছে। রাজশাহী নগরীর প্রধান খেলার মাঠ বলতে এখন মুক্তিযুদ্ধ স্টেডিয়ামকেই বোঝায়, আগে এর নাম ছিল জেলা স্টেডিয়াম। বিভিন্ন টুর্নামেন্ট এখানে আয়োজন হয়ে থাকে। আর সব মাঠের বেহাল দশা। একমাত্র রাজশাহী কালেক্টরেট মাঠ এবং রেলওয়ে মাঠ কিছুটা খেলার উপযোগী রয়েছে। কালেক্টরেট মাঠেও মাঝে মাঝে থাবা পড়ে বাণিজ্য মেলার। রাজশাহীর বৈকালী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রইচ উদ্দিন বাবু অভিযোগ করে বলেন, রাজশাহীতে ক্রীড়াক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনা থাকলেও মাঠের অভাবে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে।
রাজশাহীর শহীদ কামারুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামে গিয়ে দেখা যায়, চার কোনায় চারটি ছোট ছোট মাঠ থাকলেও সেগুলো সংস্কারের অভাবে খেলার অনুপযোগী। শুধু দুটি কোনায় কোনোমতে খেলা চলে।
রাজশাহী বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স ঘুরে জানা যায়, মাঠটিতে সকাল-বিকেল একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। কিন্তু এখানে নারীদের খেলার কোনো ব্যবস্থা নেই। এর বাইরে রাজশাহী রেলওয়ে মাঠে লাল-সবুজ এবং আল রশিদ নামে ক্রীড়া সংগঠনের উদ্যোগে ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠি হয়। এখানে ক্রিকেট প্রশিক্ষণও হয়। রাজশাহী কলেজ মাঠেও সাদ স্পোর্টসের উদ্যোগে ক্রিকেট প্রশিক্ষণ এবং খেলা হয়। এ ছাড়া শাহ মখদুম মাদরাসা মাঠে ফুটবল প্রশিক্ষণ চলে এবং এলাকার ছেলেরা ক্রিকেটও খেলে থাকে মাঠটিতে।
রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রাফিউস সামস প্যাডি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজশাহীতে খেলার পরিবেশ নেই শুধু মাঠ সংকটের কারণে। এতে করে বেশির ভাগ যুবকরা ঝুঁকে পড়ছে মাদকের নেশায়। মাঠ থাকলে জেলা ক্রীড়া সংস্থা আরো বেশি বেশি খেলার আয়োজন করতে পারবে। কিন্তু মাঠের অভাবে সেগুলো সম্ভব হচ্ছে না। এক জেলা স্টেডিয়ামের ওপর হচ্ছে একের পর এক খেলা। ফলে এ স্টেডিয়ামটিতেও খেলার পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে।’রাজশাহী নগরের অধিকাংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই নেই খেলার মাঠ। খেলার মাঠ নেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা বেসরকারি বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতেও। এসব বিদ্যালয়ের বেশিরভাগেরই একটি ভবনে পাঠদান থেকে শুরু করে সব কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়। ফলে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। খেলাধুলা চর্চার সুযোগ না পাওয়ায় দুর্বলভাবে বেড়ে উঠছে তারা। এর ফলে প্রতিদিনের নিয়মমাফিক পড়ালেখায় ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া দীর্ঘ সময় বাড়িতে কম্পিউটারে গেমস খেলায় হারিয়ে ফেলছে মনযোগ। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাথমিক পর্যায়েই শিশুদের শিক্ষার ভিত গড়ে ওঠে। এই বয়সেই শিশুদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। হীনমন্যতা থেকে বের হয়ে সাহসী হয়ে গড়ে উঠবার শিক্ষা পায় এই বয়সেই। ফলে এই বয়সেই শিশুরা যা শেখে তা সারাজীবন তাদের পথ চলতে সহায়ক হয়। প্রথম দশ বছরেই শিশুদের বিকাশ সম্পন্ন হয়ে থাকে। এইজন্য শিশুদের জন্য পড়ালেখার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা। চর্চার মধ্যে দিয়ে শিশুরা যা শিখবে তা অন্য কোনো উপায়ে সম্ভব না। এইজন্য স্কুলগুলোতে অবশ্যই খেলাধুলার মাঠ থাকা উচিত। নিয়মিত আয়োজন করা উচিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের। গ্রামের স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও শহরের স্কুলগুলোতে নেই। নিয়মিত আয়োজন হয় না সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের।রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দফতরের তথ্যমতে, বিভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে সাড়ে আট হাজার। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কিন্ডারগার্টেন স্কুল আছে চার হাজার। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে গ্রাম পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও শহর পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ নামমাত্র আছে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের বক্তব্য, সিটির সরকারি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ না থাকলেও বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে রয়েছে।তবে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত ৬০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেড়শটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই। যা আছে তাকে মাঠ বলা যায় না। স্কুলের আঙিনা বলে। এর মধ্যে একবারেই খেলার মাঠ নেই নগরীর কাদিরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুল দুইটি দেখতে একবারে পাখির খাঁচার মতো। এছাড়া বেসরকারি স্কুলগুলোতেও নেই কোনো খেলার মাঠ। নগরীর সরকারি স্কুলগুলো ছয় শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত।বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের অনেক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ আবার দখলও হয়ে গেছে। অনেক বিদ্যালয়ের মাঠেই গড়ে উঠেছে স্থাপনা। যেটুকু রয়েছে তাতে নেই খেলাধুলার পরিবেশ। বিভাগীয় তথ্যমতে, রাজশাহীতে মাঠ বেদখল হয়ে যাওয়া স্কুলের সংখ্যা ৬টি, নওগাঁয় ৬০টি, নাটোরে ৩৫টি, বগুড়ায় ২৪টি, সিরাজগঞ্জে একটি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে নগরীর গৌরহাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় গড়ে উঠেছে স্টিল ওয়ার্কশপ। সারাক্ষণ উচ্চ শব্দে কাজ চলে ওখানে। এছাড়া নগরীর উপকণ্ঠ কাটাখালী পৌর এলাকার মাসকাটাদিঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে বসানো হয়েছে সবজির হাট। শুক্র ও সোমবার নিময় করে ওই বিদ্যালয়ের মাঠে বসে হাট। স্কুল চলাকালীন হাট বসায় ওখানে বিঘ্নিত হয় শিক্ষার পরিবেশ।শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মধ্যে পড়ালেখার আগ্রহ নেই বললেই চলে। যেটুকু পড়ালেখা করে তা-ও অভিভাবকদের চাপে। এছাড়া খেলাধুলার সুযোগ পায় না বলে বেশিরভাগ সময় তারা কম্পিউটারে গেম খেলে কাটায়। এছাড়া শিক্ষকদের অব্যাহত শাসনে তারা অতিষ্ট। পড়ালেখা করতে কোনো আনন্দ পায় না।তবে বেশিরভাগ সরকারি স্কুলে খেলার মাঠ আছে বলে দাবি করেছেন বোয়ালিয়া থানা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সানাউল্লাহ। তিনি বলেন, বেশিরভাগ স্কুলেই খেলার মাঠ আছে। তবে খেলার মাঠে শুধু অ্যাসেম্বলি হয়। এরপর পুরো সময় ক্লাসে থাকে শিক্ষার্থীরা। ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগ কম থাকে।রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের উপপরিচালক আবুল খায়ের জানান, রাজশাহী নগরীর বিদ্যালয়গুলোতে খেলার মাঠ না থাকলেও গ্রাম পর্যায়ের প্রত্যেকটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ রয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্রামের প্রতিটি স্কুল ৩৩ শতাংশ জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত। আর নগরীর স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের আওতায়। পরে ওই স্কুলগুলো জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭৩ সালের আইন অনুযায়ী ওই সময়ে যে বিদ্যালয়ে যতখানি সম্পত্তি ছিল তা ওই বিদ্যালয়ের হয়ে যায়। এর ফলে বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ অবহেলিত থেকে গেছে। জেলা পর্যায়ের শহর এলাকাগুলোতেও একই অবস্থা। এর মধ্যে কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল হয়ে গেছে। তবে নতুন করে ভবন নির্মাণ হলে বহুতল ভবনের নিচতলায় শিশুদের জন্য খেলার জায়গা রাখার বিষয়টি ভাবনায় রয়েছে বলে জানান তিনি।তিনি আরো বলেন, বিভাগের প্রায় ৪ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে খেলার মাঠ নেই। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এই বিদ্যালয়গুলো দেখভালের কোনো সুযোগও নাই। যার যখন ইচ্ছা বিদ্যালয় স্থাপন করছে।সংস্কৃতিকর্মী আজিরা আফসান মীম বলেন, শিশুদের জন্য খেলার মাঠ থাকবে না তা ভাবাই যায় না। পড়ালেখার বাইরে একটু নিঃশ্বাস নেবার মতোন খোলা মাঠ শিশুরা পাবে না তা হতেই পারে না। শিশুদের মূল বিকাশই তো হয় খেলাধুলার মাধ্যমে। পড়ালেখার বাইরে মাঠে শিশুরা দৌঁড়াবে, খেলবে; তবেই না শিশুরা ভালো থাকবে। আনন্দে থাকবে। আর আনন্দের মাধ্যমে শেখাটাই প্রকৃত শেখা।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, বিদ্যালয়গুলোয় খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সামাজিকীকরণে পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলে বাস্তব পরিবেবেশে শিশুরা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না। অসামাজিক হিসেবে গড়ে উঠছে। মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এ সব শিশু কিশোর পরবর্তীতে নানা ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

Share Button


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ