৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
www.motherlandnewsbd.com

রাজশাহী আ. লীগ গলার কাঁটা তিন সহস্রাধিক অনুপ্রবেশকারী

জামি রহমান,নিজস্ব প্রতিনিধি: রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বাচ্চু ছিলেন ওই ইউনিয়ন শাখা বিএনপির নেতা। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের তাণ্ডব চলাকালে হরিয়ান এলাকায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় করা মামলার আসামি তিনি। কিন্তু এই বাচ্চু এখন আওয়ামী লীগের নেতা। বছর দুয়েক আগে রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের হাত ধরে তিনি ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন। দিনে দিনে প্রভাবশালী হয়ে উঠা বাচ্চু এখন উপজেলার টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক। মেয়াদ শেষ হলেও সীমানা নিয়ে একটি মামলার কারণে তিনি প্রায় ৯ বছর ধরে চেয়ারম্যান। মামলাটিও তাঁর ইন্ধনে হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাচ্চুর মতো রাজশাহী জেলায় বিএনপি-জামায়াত-ফ্রিডম পার্টিসহ বিভিন্ন দল থেকে আরো অনেকেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে, যাদের অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এমনকি তাঁরা বলছেন, এসব অনুপ্রবেশকারী আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলায় সবচেয়ে বেশি বিএনপি-জামায়াত, এমনকি ফ্রিডম পার্টি থেকেও নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। সবচেয়ে অনুপ্রবেশ ঘটেছে তানোর-গোদাগাড়ীতে। সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির হাত ধরে অনুপ্রবেশ ঘটেছে।’ তিনি দাবি করেন, সব মিলিয়ে গত ১০-১২ বছরে অন্য দল থেকে তিন হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। তাঁরা এখন দাপট দেখিয়ে চলেন। কেউ কেউ জনপ্রতিনিধিও হয়েছেন এরই মধ্যে।
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নগরীতেও অন্য দলের শত শত নেতাকর্মীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে গত কয়েক বছরে। এখানে বিএনপি ও ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন বেশি। এর মধ্যে কয়েকজন কাউন্সিলরও নির্বাচিত হয়েছেন।
জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্য দল থেকে কিছু নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। সারা দেশেই এমনটি ঘটেছে। এখানে দোষের কিছু নেই।’
রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ডাবলু বলেন, ‘বাচ্চু চার-পাঁচ বছর আগেও বিএনপি করতেন। এখন তিনিই আওয়ামী লীগের বড় নেতা। পবার টেন্ডারও নিয়ন্ত্রণ করেন এই বাচ্চু। তাঁর কারণে অতিষ্ঠ আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা। তাঁর জন্যই হরিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনও আটকে আছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে।’
তবে বাচ্চু টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি অস্বীকার করলেও নাশকতার মামলা থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জানা গেছে, ১৯৯৬ সালের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র থাকাকালে ছাত্রলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য ও রাজশাহী মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি এস এম গোলাম মুর্শিদ গোলাম হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি সে সময়ে নব্য আওয়ামী লীগে যোগদান করা আজিজুল আলম বেন্টু ও তাঁর ভাই রবিউল আলম বাবু। বেন্টু বর্তমান রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আর বাবু জেলা কৃষক লীগের সভাপতি। তাঁরা দুজনই গোলাম হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস আগে ওয়ার্কার্স পার্টি করতেন।
আজিজুল আলম বেন্টু দাবি করেন, ছাত্রলীগ নেতা গোলাম হত্যাকাণ্ডে তিনি জড়িত নন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বছর দুয়েক আগে তানোর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রবিন সরকারকে পিটিয়ে আহত করা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্যের সামনে। রবিনকে চাকরি না দিয়ে তানোর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তারেক সরকার অমিকে চাকরি দেওয়ার প্রতিবাদ করায় তাঁকে পেটানো হয়। তারেক সরকার অমি এখন তানোর উপজেলা চেয়ারম্যান ও যুবলীগের সভাপতি লুত্ফর হায়দার রশিদ ময়নার কাছের লোক।
রাজশাহী জেলা যুবলীগের একজন নেতা অভিযোগ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার রোডমার্চের দিনে গোদাগাড়ীতে পথসভা করেছিল বিএনপি-জামায়াত। ওই পথসভা থেকে জামায়াত নেতা ও পালপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক ওবাইদুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আরেকটি ১৫ই আগস্ট আসন্ন। সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকা জামায়াত-শিবিরের হাজার হাজার মুজাহিদ তা সংঘটিত করবে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করা হবে।’ এমন হুমকিমূলক বক্তব্য দিলেও রাজশাহী জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক ও গোদাগাড়ী জামায়াতের নেতা ওবাইদুল্লাহর স্ত্রীকে চাকরি দেওয়া হয় গোদাগাড়ীর একটি স্কুলে।
গোদাগাড়ীতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে সুবিধাভোগীদের মধ্যে রয়েছেন কাঁকনহাট পৌর মেয়র আব্দুল মজিদ। প্রয়াত বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার আমিনুলের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগে যোগ দেন আব্দুল মজিদ। সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর কাছের লোক পরিচয় দিয়ে নানা ফায়দা লুটে নিচ্ছেন তিনি।
একই উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি জয়দেব প্রামাণিক অভিযোগ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এলাকার সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ছাত্রশিবিরের চিহ্নিত কর্মী মোজাম্মেল হককে।’
গোদাগাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক এক সভাপতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গোদাগাড়ীতে এই মুহূর্তে বিএনপি-জামায়াতের অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কোণঠাসা। সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর সবচেয়ে কাছের লোক এখন বিএনপি-জামায়াতের ওই অনুপ্রবেশকারীরা। তাদেরই অনেককে চাকরি দেওয়া থেকে শুরু করে দলের বিভিন্ন পদে বসিয়ে রেখেছেন তিনি। এ ছাড়া দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে রেখেছেন সংসদ সদস্য।’
দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাহার আলী ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। সেই আজাহার আলী এখন আওয়ামী লীগ নেতা। বছর চারেক আগে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করে নৌকা প্রতীক পেয়ে চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।
বাগমারা উপজেলার এক সময়ের জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা আব্দুস সালাম এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা। রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হকের সঙ্গে সখ্যের কারণে গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। পরে গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সালামের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

Share Button


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ