৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
www.motherlandnewsbd.com

‘কওমি স্বীকৃতি ও হেফাজতের আন্দোলন এক নয়’

১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সঙ্গে সম্প্রতি সরকার ঘোষিত কওমি সনদের স্বীকৃতির কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি হেফাজতে ইসলামের আমির এবং তার নেতৃত্বেই ছয়টি বোর্ডকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি ঘোষণার পর অনেকেই আল্লামা আহমদ শফী ও হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে তাকে সরকারের ‘দালাল’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে তিনি এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, কওমি সনদের স্বীকৃতি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর অধিকার। এর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই।

তার নেতৃত্বে কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি পাওয়ায় আল্লামা শফীকে সংবর্ধনা দিয়েছে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আল আমিন সংস্থা নামের একটি সংগঠন। সেখানে আল্লামা শফীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাওলানা নুরুল ইসলাম। বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

ব্লগে ইসলামবিরোধী লেখালেখির প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ২০১৩ সালে ১৩ দফা কর্মসূচি দিয়ে আলোচনায় আসে হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ৬ এপ্রিল ঢাকায় লংমার্চ করে নিজেদের শক্তির জানান দেয় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটি। তবে এর এক মাস পর ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে শাপলা চত্বরে অবস্থানকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। ওই রাতে ব্যাপক অভিযানের মাধ্যমে হেফাজতের নেতাকর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে সরাতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই অভিযানে নিজেদের শত শত নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে বলে দাবি করলেও হেফাজত এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

আল্লামা শফী হেফাজতে ইসলামের আমির। তিনি দেশের প্রবীণ আলেম ও কওমি মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষাবোর্ড বেফাকুল মাদারিসিলি আরাবিয়া বা বেফাকেরও চেয়ারম্যান। কওমি সনদের স্বীকৃতিও তার নেতৃত্বেই অর্জিত হয়েছে। এই স্বীকৃতি ঘোষণার পর হেফাজতের আমির সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার প্রশংসা করায় অনেকে তার সমালোচনা করেন। আজকের অনুষ্ঠানে লিখিত বক্তব্যে আল্লামা শফী সেসব সমালোচনার জবাব দেন।

লিখিত বক্তব্যে আল্লামা শফী বলেন, ‘তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে নানা ফিতনাও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে মুসলমানদের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদ বাড়ছে। হেফাজতকে নিয়ে স্যোশাল মিডিয়ায় উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচার চালানো হচ্ছে। কোনো ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়া, স্যোশাল মিডিয়া বা ব্যক্তি বিশেষের কথায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

আল্লামা শফী বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা সনদের স্বীকৃতি আর হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফার আন্দোলন এক নয়। হেফাজতে ইসলাম মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষার সংগ্রামে একটি বৃহত্তম ধর্মীয় সংগঠন। আমরা এই ঈমানি আন্দোলনের নীতি ও আদর্শ সংরক্ষণে সদা প্রস্তুত রয়েছি।’

হেফাজত কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য হেফাজতের নেই। কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না, কাউকে মনোনয়ন বা সমর্থন দেয়নি, দেবেও না। কিন্তু কেউ যাতে এর প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনে আসতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। হেফাজতের নীতি আদর্শের ওপর আমরা অটল রয়েছি। ১৩ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত হেফাজতের আন্দোলন চলবে ইনশাআল্লাহ।’

বেফাকের সভাপতি বলেন, ‘সনদের স্বীকৃতি কারো করুণা নয়, এটা আমাদের অধিকার। নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রে দেওবন্দি আলেমদের বহু অবদান রয়েছে। সনদের স্বীকৃতির বিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়ায় বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানানো মানে সরকারের কাছে কওমি উলামায়ে কেরামদের বিক্রি করে দেয়া নয়।’

‘আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন, মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে এম.এ-এর সমমান প্রদানের দাবিটি দীর্ঘ দিনের। সম্প্রতি বেফাকসহ আঞ্চলিক বোর্ডসমূহের নেতৃস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্তমান সরকারের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে স্বীকৃতির দাবিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে জাতীয় সংসদে বিল পাস করাতে আমরা সক্ষম হয়েছি।’

আল্লামা শফী বলেন, ‘আমি ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রেখে এই সনদের স্বীকৃতি আদায় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ সফলও হয়েছি। এই জন্যে আমরা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি এবং সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।’

‘সনদের স্বীকৃতির বিল সংসদে পাস হওয়ার পর থেকে আমার বিরুদ্ধে স্যোশাল মিডিয়ায় বিশেষ কিছু লোক নানা অপপ্রচার, অশ্লীল বাক্য, কটূক্তি করেই চলেছে। অনেকে বলছে, আমি নাকি আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি। এত সমালোচনা হলে, মানুষ হিসেবে কতটুকু সহ্য করতে পারি?’

‘তাই গত ১ অক্টোবর হাটহাজারী মাদ্রাসায় চট্টগ্রাম জেলা বেফাক কর্তৃক আয়োজিত পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে স্পষ্ট বলেছিলাম, আমি আওয়ামী লীগ হয়ে যাইনি। যারা আমাকে আওয়ামী লীগ বলছেন তারা মিথ্যাবাদী।’

আহমদ শফী বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা হলো, জাতীয় মাদ্রাসা। দল মত নির্বিশেষে সবার সাহায্য সহযোগিতায় এসব মাদরাসা পরিচালিত হয়। আমি প্রচলিত কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত নই। তাই আমার বক্তব্যকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে দেখবেন না, ভুল ব্যাখ্যা করবেন না। আমাদের যারা ভালোবাসে, যারা আমাদের কাছে আসে, তাদেরকে দীনের কথা বলা, নসিহত করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা আলেম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।’

Share Button


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ